৮ বছরেও চাকরি স্থায়ী হয়নি, মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন ৭৪৫ জন মাঠসহকারী !

গত আট বছরেও স্থায়ী হয়নি সরকারি মালিকানাধীন অগ্রণী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় মাঠসহকারী পদে কর্মরত ৭৪৫ জন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীর চাকরি। তাই ব্যাংকের লোকবল সংকট কমাতে এসব মাঠসহকারীরর চাকরি স্থায়ীকরণ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদবী এবং বেতন নির্ধারণের জন্য প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ, অর্থমন্ত্রণালয়ের কাছে জোরালো দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

agrani bank field officer claim job permanent
চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে আন্দোলনরত অগ্রণী ব্যাংকের মাঠসহকারীরা…

জানা যায়, ২০১১ সালের ১ আাগস্ট চাকরি স্থায়ীকরণের আশ্বাস দিয়ে কোন রকম নিয়োগপত্র ছাড়াই দেশব্যাপী ৭৪৫ জন স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীকে মাঠসহকারী পদে নিয়োজিত করে অগ্রণী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। এরপর থেকে গত আট বছর তাদের দিয়ে ঋণ আদায়, বিতরণ, কৃষকের হিসাব খোলা ও সাধারণ হিসাব খোলা, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা প্রদান, পেনশন প্রদান, রেমিট্যান্স প্রদান ও বিভিন্ন ডকুমেন্টস তৈরিসহ সাধারণ ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করলেও তাদের চাকরি স্থায়ী করেনি প্রতিষ্ঠানটি।

আরো জানা যায়, নিয়োগের পর বিভিন্ন সময় চাকরি স্থায়ী করার আবেদন ও আন্দোলনও করেন ভুক্তভোগীরা। আন্দোলনের এক পর্যায়ে গত বছরের ২১ অক্টোবর তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত অগ্রণী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান জায়েদ বক্ত ও এমডি মো. শামসুল ইসলামকে একটি চিঠি দেন। চিঠিতে অর্থমন্ত্রী ওই বছরের নভেম্বরের মধ্যে অস্থায়ী মাঠসহকারী হিসেবে কর্মরত সকলের চাকরি স্থায়ী করে প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেন।

কিন্তু সে প্রতিবেদন এখন পর্যন্ত দাখিল করেননি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। যদিও ওই চিঠির প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটির এমডি মো. শামসুল ইসলাম অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করা ৭৪৫ জন মাঠসহকারীর চাকরি স্থায়ীকরণে অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (পল্লী ঋণ) গ্রেড-০২ এর শূণ্য পদ সৃষ্টির জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় বরাবর তিনটি চিঠি প্রদান করেন। কিন্তু অর্থমন্ত্রণালয় থেকে সেই চিঠির জবাবও আজ পর্যন্ত অগ্রণী ব্যাংকের হেড অফিসে এসে পৌঁছায়নি। বরং অর্থমন্ত্রণালয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে নির্দেশনার মাধ্যমে জানিয়েছে অগ্রণী ব্যাংকের পদ সৃষ্টির দায়িত্ব তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় হবে।

অর্থমন্ত্রণালয় জানায়, অগ্রণী ব্যাংক ২০০৭ সালে লিমিটেডে রূপান্তরিত হয়েছে এবং ২০০৮ সালে নিজস্ব নিয়োগ প্রবিধানমাল প্রণয়ন করেছে। তাই ওই ব্যাংকের পদ সৃষ্টির দায়িত্ব তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় হবে। এদিকে অগ্রণী ব্যাংকের পুণঃ নিয়োজিত এমডি মো. শামসুল ইসলাম জানান, তার একার পক্ষে মাঠসহকারী হিসেবে কাজ করা ৭৪৫ জনের চাকরি স্থায়ী করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব নয়। এ ব্যপারে অর্থমন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন।

অর্থমন্ত্রণালয় এবং অগ্রণী ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের এমন ঠেলাঠেলিতে গত আট বছর ধরে চাকরি স্থায়ী হওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন উচ্চ শিক্ষিত ৭৪৫ জন মাঠসহকারী। যারা নো ওয়ার্ক, নো পেমেন্ট ভিত্তিতে এতদিন ধরে মাঠ পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছেন। এমনকি তাদের কোন নির্দিষ্ট বেতন, ছুটি বা চাকরির নিশ্চয়তা পর্যন্ত নেই। চাকরিচ্যুতির আশংকায়ও থাকেন অনেকে।

ইতোমধ্যে সরকারি চাকরির বয়সও (৩০ বছর) অতিক্রম করেছে অনেকের। আর দূরারোগ্য ব্যাধিতে মৃত্যুবরণ করেছেন ফেনী জেলার লিটনসহ বেশ কয়েকজন। যাদের পরিবার বর্তমানে অভাব অনটনে মানবেতর দিনযাপন করছে। ব্যাংকের অব্যবস্থাপনায় চাকরিও ছেড়েছেন অনেকে। যাদের মধ্যে কেউবা বেকার বসে আছেন, আবার কেউবা অন্যত্র চাকরি নিয়েছেন।

যারা এখনও কাজ করছেন তারা সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বা তার বেশি সময় ধরে কাজ করেন। দিন শেষে তাদের পকেটে আসে মাত্র ৬৫০ টাকা, যা দিয়ে একটি পরিবার চালানো প্রায় অসম্ভব। মাঝে মাঝে জরুরি ঋণ আদায়ের জন্য ছুটির দিনেও তাদের কাজ করতে হয়। মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঋণের টাকা আদায় করতে হয়। কিন্তু এ জন্য তাদের কোন প্রকার বেতন বা ভাতা দেওয়া হয় না। তারা যদি অসুস্থতার জন্য কাজে যেতে না পারেন বা ব্যাংক বন্ধ থাকে তাহলেও তাদের কোন বেতন দেয়া হয় না। যা আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় শ্রম আইন লঙ্ঘন করার সামিল।

এসব উচ্চ শিক্ষিত মাঠসহকারীরা যে হারে মজুরি পান তা ব্যাংকে নিয়োজিত অষ্টম শ্রেণি পাশ এমএলএসএস বা ড্রাইভারের মুজরির চেয়ে মাত্র ১০০/- টাকা বেশি। অন্যদিকে মাঠসহকারীদের সমান ডিগ্রিধারী একজন স্থায়ী অফিসার পান ৫ গুন বেশি, সিনিয়র অফিসার পান ৯ গুন বেশি এবং ক্রমান্বয়ে উচ্চপদে নিয়োগকৃতরা পান ২৫/২৬ গুনেরও বেশি সুযোগসুবিধা।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফার অংশ হতে স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনের ৩.২৫ গুন ইনসেন্টিভ বোনাস প্রদান করা হয়। কিন্তু অস্থায়ীদের তা দেয়া হয়নি। অথচ ব্যাংকের মুনাফা অর্জনে এসব মাঠসহকারীর ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংকের গ্রামীণ শাখাগুলোতে লোকবল সংকট রয়েছে। কিন্তু অস্থায়ী কর্মী হওয়ায় এসব মাঠসহকারীরা টি-টোয়েন্টিফোর সফটওয়ার আইডিতে কাজ করার সুযোগ পাননা। মাঠ পর্যায়ে অস্থায়ীভাবে কাজ করা এসব কর্মীর চাকরি স্থায়ী করা হলে এই লোকবল সংকটের সমাধান হতে পারে বলে মনে করেন ব্যাংকের অনেক কর্মকর্তা। তাই ভুক্তভোগিরা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ এবং অর্থমন্ত্রণালয়ের কাছে অতিসত্বর তাদের চাকরি স্থায়ী করে যোগ্যতার ভিত্তিতে পদবী ও বেতন নিধারণের দাবি জানিয়েছেন।